সরস্বতী নদীর দুর্ভোগ

এই মুহূর্তে সাহিত্য / কবিতা

ময়ূমী সেনগুপ্ত, খবরইন্ডিয়াঅনলাইনঃ  মহর্ষি বশিষ্ঠের প্রতি ঋষি বিশ্বামিত্রের ঈর্ষার মাশুল দিতে হয়েছিল সরস্বতী নদীকে

ভারতীয় পুরাণে সরস্বতী নদীর কথা বর্ণিত। এই নদীধারা ক্ষীণ হয়ে এলেও অবলুপ্ত হয়নি এখনো।

কথায় আছে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় আর উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। এখানে রাজা যদিও একজনই। তিনি হলেন বিশ্বামিত্র। তাই এখানে বলা ভালো রাজায়-মুনিতে যুদ্ধ হয়। যদিও যুদ্ধটা করবার উদ্যোগ রাজার তরফ থেকেই বেশি ছিল। মুনিটি নেহাত ভালোমানুষ।

হ্যাঁ রাজা। বিশ্বামিত্র যে ঋষি হওয়ার আগে একজন রাজা ছিলেন , একথা হয়তো অনেকেরই জানা নেই। মহর্ষি বশিষ্ঠের সঙ্গে তাঁর শত্রুতার সূত্রপাত রাজা থাকালীন সময়েই।

যাই হোক যেকথা বলছিলাম , এখানে উলুখাগড়ার প্রাণ না গেলেও ঔপন্যাসিকের ভাষায় ডুইং আর সাফারিং দুয়ের ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল বেচারা সরস্বতীকে।

সরস্বতী নদীর তীরে ছিল স্থানু নামক তীর্থ। এই তীর্থের পূর্ব তীরে মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রম আর পশ্চিম তীরে ছিল বিশ্বামিত্রের আশ্রম। শান্ত সমাহিত চিত্তে তপস্যারত বশিষ্ঠকে দেখে মনে মনে রাগে ফেটে পড়েন। তাঁর তো আবার নিজের সাধনার থেকে মহর্ষির উপর বেশি নজর ছিল কিনা। ভাবেন মনে মনে। একদিন সব ছিল আমার। রাজসিংহাসন , অতুলনীয় বৈভব। সব ছেড়ে দেখেছেন তিনি এই মানুষটার চেয়ে উঁচুতে নিজের আসন প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু রাজা হিসেবেও এই মানুষটাকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। আবার মুনিসমাজেও এসে দেখেন সকলের মুখে বশিষ্ঠের প্রশংসা। সকলের প্রিয় ওই মানুষটা।

নানা ভাবে বশিষ্ঠের ক্ষতি করতে চেয়েছেন বিশ্বামিত্র। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও মনে করতে পারেন না যে , কোনোদিন বশিষ্ঠ এতটুকু দুর্ব্যবহার তাঁর সঙ্গে করেছেন বলে। বরং ঋষিসমাজে সকলের আগে এই মানুষটার কাছে সদর অভ্যথর্না পেয়েছেন বিশ্বামিত্র। অনেকেই তাঁকে দেখে বিরক্তিতে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন। আজ-ও তাঁর সামনে ঋষিকুলের অনেকেই মাথানত করে বটে। কিন্তু তাতে শ্রদ্ধা নেই , আছে আতঙ্ক। মাথা নত করবার মধ্যে দিয়ে বিশ্বামিত্রের প্রতি তাঁদের সীমাহীন ঘৃণাই ফুটে ওঠে। অনেকটা এরকম মনোভাব। বাবা রে এর তো অনেক ক্ষমতা শুনেছি। যদি কোনো ক্ষতি করে দেয়। তার থেকে মাথা নিচু করে সরে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। মানুষের এই মনোবৃত্তিটাই বিশ্বামিত্রকে কষ্ট দেয় সবচাইতে বেশি।

মনে হয় তাঁর মাঝে মাঝে। চলে যাই সব ছেড়ে এখন থেকে দূরে কোথাও। যেখানে আমাকেও কেউ চেনে না , আমিও কারুকে চিনি না। যেখানে বশিষ্ঠ নেই। পরক্ষণেই মনকে শক্ত করেন তিনি। না , ওই সাধুকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতেই হবে। মনে মনে পরিকল্পনা করতে থাকেন বিশ্বামিত্র , মহর্ষিকে জব্দ করবার।

একদিন দারুণ অসন্তুষ্ট হয়ে সরস্বতী নদীকে স্মরণ করলেন। আদেশ করলেন নদীকে বশিষ্টকে তাঁর কাছে নিয়ে আসতে। এদিকে সরস্বতী নদী ভাবলেন শেষে কিনা মহর্ষি বশিষ্ঠের মতন মহান একজন ঋষির মৃত্যুর কারণ আমি হতে পারি না। আমি এমন কাজ করবো , যাতে সাপ মরবে অথচ লাঠি-ও ভাঙবে না। বশিষ্ঠের কাছে এসে নদীমাতা সমস্ত ঘটনাটি জানালেন অত্যন্ত মর্মাহত চিত্তে।

দয়ালু মুনি সব কথা শুনে বললেন , মা তোমার কোনো চিন্তা নেই। এর আগেও অনেকেই নানা ভাবে আমার ক্ষতিসাধনের চেষ্টা করেছে। পরম করুণাময়ের আশীর্বাদে তাঁরা বিফল হয়েছে। আর এবারেও এমনটাই ঘটবে বলে আমার বিশ্বাস। আর যদি তা না হয় , বুঝবো ঈশ্বরের এমনটাই ইচ্ছে। তাঁর ইচ্ছে না হলে যে কিছুই হতে পারে না। তুমি বরং বিশ্বামিত্র যা বলেছেন তাই করো।
রাত্রি প্রভাত হলো। সরস্বতী ইতিমধ্যে আপন কর্তব্য স্থির করে ফেলেছেন। তপস্যারত মহামুনি বশিষ্ঠ। তখন বিকট শব্দে নদীতীর ভেঙে পড়লো। নদীস্রোত নিয়ে এলো বশিষ্টকে বিশ্বামিত্রের তপোবনে।

বিশ্বামিত্র তো মহাখুশি। তিনি বশিষ্টকে হত্যার জন্য অস্ত্র খুঁজতে গেলেন। এই অবসরে বশিষ্টকে আবার সরস্বতী নদী পূর্ব উপকূলে পৌঁছে দিলো।

বিশ্বামিত্র এসে মহামুনিকে না দেখতে পেয়ে প্রথমটায় অত্যন্ত অবাক। কারণ যতদূর চেনেন তিনি বশিষ্টকে , তাঁর পালিয়ে যাওয়ার মনোবৃত্তি একেবারেই নেই। ধ্যানযোগে তিনি সবটাই জানতে পারলেন। বুঝতে পারলেন এ সরস্বতী নদীর চাতুরী। ক্রোধে ফেটে পড়লেন বিশ্বামিত্র। নিষ্ঠুর অভিশাপ দিলেন সরস্বতী নদীকে। তোর জল এখুনি শোণিতে পরিণত হোক। তুই তোর মহিমা আভিজাত্য সব কিছু হারাবি। সীমাহীন দুর্দশা হবে তোর। সামান্য নদী হয়ে তুই বিশ্বামিত্রকে অপমান করবার স্পর্ধা রাখিস। নিজেকে বেশি বুদ্ধিমান মনে করিস, তাই তো ! এবার তোর প্রতারণার সমুচিত প্রতিফল লাভ কর।

দেখতে দেখতে সরস্বতী নদীর জল রুধিরে পরিণত হলো। হয়ে উঠলো রাক্ষসদের সুপেয়। কয়েক বছর কেটে গিয়েছে। একদল শৈব সন্ন্যাসীর আগমন ঘটলো সরস্বতী নদীর তীরে যাগ যজ্ঞ করবার জন্য। সরস্বতী নদীর এই দুর্দশা দেখে তাঁরা অবাক। তাঁদের অনুরোধে কাঁদতে কাঁদতে সরস্বতী নদী সকল ঘটনা বিবৃত করলেন।

সব কিছু শুনে তপস্বীরা প্রতিশ্রুতি দিলেন সরস্বতী নদীর দুর্দশা দূর করবার। মহাযোগী তারকনাথের স্তবে লীন হয়ে রইলেন সেই তপস্বীকুল শোণিত পরিপূর্ণ সরস্বতী নদীর তীরেই। এক বছর অতিক্রান্ত হলে তপস্যায় সন্তুষ্ট শিব দেখা দিলেন। তাঁর ত্রিশূল স্পর্শ করাতেই সরস্বতীর জল হয়ে উঠলো আগের মতোই স্বচ্ছতোয়া , দু হাত জোড় করে প্রণিপাত জানালেন শিবকে সরস্বতী নদী। ধন্যবাদ দিলেন তপস্বীদেরকেও। শিব নদীকে অভয় দান করে কৈলাসে ফিরলেন।

এই ভাবেই বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠের মধ্যে বিরোধিতা বা দ্বন্দ্ব —- যাই বলা হোক না কেন , তার মাশুল দিতে হয়েছিল নিরপরাধ সরস্বতী নদীকে। যুগে যুগে এমনটাই হয়ে চলেছে। ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের মধ্যে মতানৈক্যের জন্য দুর্দশাগ্রস্থ হতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে এমনকি নিরীহ প্রকৃতিকেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *