গল্প ভুতের বিয়ে ( লেখক – পবিত্র চক্রবর্তী)

এই মুহূর্তে সাহিত্য / কবিতা


কয়েকদিন আগে মামা বাড়ী থেকে এলো নেমন্তন্ন পত্র । অবাক হওয়ারই পালা , কারণ মামার যা বয়েস তাতে আর যাইহোক বিয়ে অন্তত হবে না । মা ছোঁ মেরে কার্ড ছিনিয়ে নিয়ে পড়তে থাকেন আর ভ্রূ জোড়া ধীরে ধীরে বক্র গতি নেয় ।
কার্ডে বড় বড় হরফে লেখা , আগামী ৩ ডিসেম্বর চতুর্থী তিথি কৃষ্ণপক্ষের মহা শুভক্ষণে , বেলতলা নিবাসী ব্রহ্ম বাবাজীবনের সহিত শেওড়াগাছির সুশ্রী শাঁকি মায়ের বিবাহ । আপনাদের উপস্থিতি কাম্য । নীচে , পুন: দিয়ে লেখা – হৃদয়ে প্রাণ ভরা সাহস একান্তই কাম্য ।
আমার মামার এ হেন ভুতুড়ে কম্ম নতুন নয় । মা ঝাঁঝিয়ে ওঠার আগেই আমি সরে গেলাম , আমার বেশ লাগে এসব ।

মা আর বাপী বেশ গজগজ করছিলেন আমার যাওয়া নিয়ে , সামনেই উচ্চ মাধ্যমিকের টেস্ট । আমার একটি মহত্ গুণ আছে , সেটি হল টুপি পড়াতে আমি ওস্তাদ । আর তার শিকার মা বাপী আগে হন , এবারও হলেন ।
সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম , নইলে মামার বাড়ীতে পৌঁছানো বেশ কষ্ট দায়ক ।
দুটি ট্রেন , একটি টোটো অতঃপর হেঁটে যখন পৌঁছালাম তখন সুজ্জি মামা পশ্চিমে কাত হতে শুরু করেছে ।
লোহার ঢাউস গেট আর গোটা কয় পাড়ার নেড়ি আমার আগমনে সোচ্চার হয়ে উঠলো ।
কোন ক্রমে ফাটল ধরা আদ্যিকালের বাড়ীতে ঢুকে ” মামা ” বলে বারকয়েক ডাক ছাড়তেই মামা লুঙ্গির গিঁট বাঁধতে বাঁধতে হাজির ।
– ” কি রে এসে পরেছিস ভালোই হল ,আর শোন লোকজন বিশেষ কেউ নেই ।”
আমি আর কী বলি , মামা নিজেই বলে চলেছে । একটু থেমে আবার বলে —
” বুঝলি কিনা আমরাই বর পক্ষ আবার আমাতে আর তোতেই কনে পক্ষ । আর বাকীরা সব তেনাদের সম্বন্ধী ।”
আমার ভ্যাবলা মার্কা মুখ দেখে মামার ঠোঁটে হাসি খেলে যায় । কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলে – ” ঘড়ে ঢোক সব বলছি ।”


রাত্রে জব্বর খাওয়া হল । মামা আর আমি দাদুর আমলের খাটে শুয়ে পড়লাম । কিন্তু মামা এখনো বলল না পুরো বিষয়টি । রাত কটা হবে মনে নেই , একটা হালকা কান্নার শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল ।
অন্ধকারে ঘড়ের বাতি জ্বালাতে যাব কিন্তু বারকয়েক সুইচ টিপতে বুঝলাম লোডশেডিং । এদিকে কান্নার শব্দ থেমে থেমে হয়েই যাচ্ছে ।
উত্তরের জানলাটা আন্দাজে খুলতেই শিরশিরে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকতে শুরু করে । গ্রামে গাছ গাছালি বেশী । ভাঙা চাঁদের আলোয় গাছগুলোর ছায়া যেন সামনের উঠোনটাকে ঘিরে ধরে গ্রাস করতে চাইছে ।
শীতের দীর্ঘ রাতে একটা মেয়েলী কান্না আর তার সাথে কে যেন ফিসফিস করে কথা বলে যাচ্ছে ।
ভাল করে বুঝতে যাব ঠিক এমন সময় , গাছের ছায়া ভেদ করে একটা বাদুড় অদ্ভুত চিঁ চিঁ শব্দ করতে করতে আমার মুখের সামনে ডানার ঝাপটা মেরে চলে গেল । আমি ভীতু না , তবে এই পরিবেশটা এমন হয়ে আছে যে , বেশ বুঝতে পারলাম শীতের রাতেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে ।
কান্নাটা যেমন আচমকা শুরু হয়েছিল তেমনি বন্ধও হয়ে গেল হঠাত্ করে । রাতটা মরা চাঁদের সাথে পাল্লা দিয়ে কুয়াশার চাদরে ঝিম মেরে গেল । শুধু গোটা কয়েক শেয়াল খ্যাঁক খ্যাঁক করে বিদঘুটে আওয়াজ করে রাতের নিস্তব্ধতাকে আরও বেশী জমাট করে দিয়ে গেল ।
মামার হেলদোল নেই । সেই যে নাকের বাদ্যি প্রথম থেকে শুরু হয়েছিল এখনো সপ্তম সুরে বেজে যাচ্ছে । আমারও চোখে ঘুম যেন থাবা মারতে বসেছে ।

অনেক আগেই সকাল হয়ে গেছে । চোখ মেলতেই দেখি পাশে চায়ের পেয়ালা ঢাকা । চোখে মুখে জল দিয়ে সবে মাত্র চায়ের কাপে ঠোঁট দিয়েছি , দেখি মামা আসছে । পিছনে এক তাল গাছের মত লোক । ঘাড়ে আর হাতে মস্ত থলে ।
– ” আহা মেছো , সাবধানে রাখ বাবা জিনিষ পত্তর , আর হ্যাঁ গলা কাটার বৌকে বল গে মাছ কূটতে ।” মেছো বলে লোকটা মাথা দুলিয়ে চলে যেতেই মামা আমার দিকে তাকিয়ে বললে, ” উঠে পরেছিস , বেশ বেশ , রাতে ঘুম হয়েছিল তো ভাল !”
-” মামা , আমি কিছু বুঝতে পারছি না ! কাল রাতে…”
মাঝ পথেই মামা হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলো । থাকতে না পেরে একটু রাগত গলায় জিজ্ঞাসা করলাম , ” ব্যাপারটা কী বলতো তোমার ? অমন উদ্ভট বিয়ের কার্ড , রাত বিরেতে মেয়ের কান্না !!”
মামা ক্ষণিক থম মেরে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে উঠলো , ” শাঁকি মাকে বুঝিও আর পারা গেল না দেখছি । ব্রহ্ম ভাল ছেলে , জাত বামুন । ”
– ” তা তোমার শাঁকি মায়ের কাঁদার কারণটা কি ভুতের মত !”
– ” আর বলিস না ভাগ্নে , মা যে আমিষ ছাড়া থাকতে পারে না আর ব্রহ্ম টোটাল নিরামিষ…এই নিয়েই ঝামেলা ।”
– ” মামা বিয়ের কার্ডে লিখেছ , যাদের সাহস আছে তারা এস , এটার অর্থ ?”
– ” ওমা লিখবো না !! এ তো যে সে বিয়ে নয় রে ; রীতিমত ভুতের বিয়ে ।”
এরপর আমার মুখের বাক্য মুখেই থেকে গেল । মামা দিচ্ছে ভুতের বিয়ে ! মনের কথা বুঝতে পেরে মুখটা নামিয়ে বললেন , – ” ওই যে বাজার করে নিয়ে এলো ও গেছো ভুত । মাছ কুটবে স্কন্ধ কাটা ভুতের বৌ । মরার পর আমিই তো এদের আশ্রয় দিয়েছি এই বাড়ী আর বাগানে ।”
আমার ভিরমি খাওয়ার জোগাড় । দাঁতে দাঁত যেন খটাখট করে লেগে যাচ্ছে ।
মামা স্বান্তনার স্বরে বললে , ” বেচারীরা বড্ড ভাল , অপঘাতে মৃত্যুর পর ওরা বেশী ভাল হয়ে গেছে ।”

বিয়ের রাত । মামার ভুত চ্যালারা প্রায় নিমেষেই বাগানের খানিক অংশ পরিষ্কার করে ম্যারাপ বেঁধেছে ইতিমধ্যে । অঘ্রাণ মাসের উত্তরের হাওয়ায় আজ চাঁদ ঢেকেছে মুখ মেঘের আড়ালে ।
ব্রহ্মদত্যি আর শাঁকচুন্নীর পরিণয়ে হাজির মামদো থেকে জোলো ভুতের ছা । সে এক হই হই ব্যাপার । জোনাকীরা টুনি বাল্বের মত জ্বলছে নিভছে । মাঝে মধ্যেই প্যাঁচার কর্কশ ডাক । মামার হাঁকডাক । আর আমার অবস্থা কহতব্য নয় । আমি শ্রী শ্যামা চরণ , মারপিট বিশারদ , আপাতত শ্যামা ছেড়ে মনে মনে শ্যাম নাম জপছি । মামা যতই বলুক , স্বচক্ষে ভুত বিবাহ আমার টনক নড়াতে শুরু করে দিয়েছে ।
মামা বলে ডাক গলা থেকে না বেরিয়ে মা – মা বলেই ডিগবাজি খাচ্ছে ।
-” হ্যাঁ রেঁ এঁখাঁনে কেঁন ? এঁগিয়ে বেঁ দেকেঁ আঁয়…..। ” ঠাণ্ডা হাতটা পিঠে উপর ছুঁয়ে নাকি সুরে কে যেন বলে উঠলো । আর তারপরই ঘুটঘুটে অন্ধকার ।
দূরে বৈষ্ণবদের দল প্রতিদিনের মত গান গেয়ে সকালের আগমন জানাচ্ছে । চোখটা মেলতেই দেখি মা মাথার পাশে বসে চা খাচ্ছেন । আমি হতভম্ব । একটু উঠে বসতেই দেখি গত রাতের ব্রহ্মদৈত্য , শাঁকচুন্নী খোশ গল্প জুড়েছে বাপীর সাথে ।
আমি উঠতেই ওরা ঘরে ঢুকলো । ইতিমধ্য মামাও হাজির । আমার চোখে মুখে হাজারটা প্রশ্ন ফুটছে দেখেই বাপী হাসতে হাসতে বললেন – ” এ হল শালার মস্ত প্ল্যান । সাহসী -ডোন্ট কেয়ার ভাব , দেখলি তো ভুতের গুঁতোতে ফিউজ কেমন হলি ।”
আমার থমথমে মুখ দেখেই মা বললেন , ” আসলে এনারা গ্রামে শীতকালে যাত্রা করেন । পড়াশুনা ছেড়ে সারাদিন রক বাজী করছিলি । তোর মামাকে বলতে , ঠিক করা হয় তোর আসল সাহস দেখার ।”
গুরুগম্ভীর অবস্থা দেখে শ্যামলী মাসি ওরফে শাঁকচুন্নী কাছে এসে মিষ্টি গলায় বললেন -” দেখ সাহস আর সাহসী মুখে বললেই হয় না , ওটা থাকে মনের মধ্যে । তুমি পরীক্ষাতে ভাল ফল করার সাহস দেখাও , দেখবে তুমি অনায়াসে জিতবে ।”
এতক্ষণ পর মামা বললে , ” অনেক হল ভুতুড়ে আলোচনা । ভুতদের যাত্রা রাতের বেলায় গ্রামের সবাই মিলে দেখবো ; শহরে তো আর এ সব হয়ই না আর ।”
এতক্ষণ পর আমার মুখে হাসি দেখা গেল । মনে মনে ভাবলাম , আমার থেকেও টুপি পরানোর বড় বড় ওস্তাদ আছে । তবে এ টুপি ভালোর জন্য , শিক্ষার জন্য ॥

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *