হারিয়ে যাওয়া লোকসংস্কৃতিকে ফিরে পেতে মুখোমুখি কবি অরুণ কুমার-এর সাথে রিমা এবং মোহনা

এই মুহূর্তে সাহিত্য / কবিতা


চলমান জীবনে গতিময়তা যেভাবে নাগরিক সভ্যতাকে আচ্ছন্ন করেছে, যে সমাজে আমরা সবাই ছুটছি যে যার অলক্ষ্যে। এই গতিময় জীবনকে কিছুটা হলেও শান্তি দেয় বাংলার অফুরন্ত লোকসংস্কৃতির উপাদান। লোকসংস্কৃতিই হল বাংলার শিকড়। এই লোকসংস্কৃতিকে সঙ্গী করে দীর্ঘদিন রয়েছেন যিনি তিনি হলেন আমাদের সকলের প্রিয় কবি অরুণ চক্রবর্ত্তী। তার কাছ থেকেই আমরা জানব লোকসংস্কৃতি বিষয়ে জানা অজানা নানান তথ্য।

*প্রশ্ন:* প্রথমেই আপনাকে বলি আমাদের সকলের প্রিয় এবং জনপ্রিয় গান “লাল পাহাড়ির দেশে যা”-এর লিরিক্সগুলি আপনার মাথায় এল কিভাবে?
*উত্তর:* কবিগুরু বলেছিলেন “নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই”, ঠিক তেমনই একটি মহুয়া গাছকে দেখেছিলাম। সেটা হয়ে আছে কোথায়? শ্রীরামপুর স্টেশনে। আমাদের হুগলী তো কৃষির জায়গা….তাহলে লাল মাটির দেশের গাছ এখানে কি করে এল? একে তো এখানে ঠিক মানাচ্ছে না। আই মিস্টেক্স আমাকে তাড়া করতে থাকে, আর তখনই এই গাছকে নিয়ে লিখে ফেললাম কটা লাইন….“হায় দ্যাখো গো তু ইখানে কেনে? লাল পাহাড়ির দেশে যা রাঙামাটির দেশে যা…”

*প্রশ্ন:* পেশায় তো ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। হঠাৎ কর্মরত শিল্প প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে মাটির টানে নিজেকে ভাসালেন কেন?
*উত্তর:* নিজেকে সর্বত্র জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। চাকরির জন্য জগতকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। তখন মনে হল এই কাজটা আমার জন্য নয়। আমাকে এরবাইরে যেতে হবে। তারপর থেকে অনেক ট্রেকিংও করেছি। সেই থেকেই আদিবাসীদের কাছে যাওয়া, তাদের সাথে মেশা, আর সেই থেকেই মাটির প্রতি একটা টান এসেছিল।

*প্রশ্ন:* আপনি কি ছোটোবেলা থেকেই এই লোকশিল্পের প্রতি আগ্রহী ছিলেন?
*উত্তর:* হ্যাঁ, শুধু লোকশিল্পই নয়, সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসাও আমার বাচ্চাকাল থেকেই ছিল।

*প্রশ্ন:* এইমুহূর্তে আপনার পছন্দের লোকশিল্পী কে?
*উত্তর:* ঠিক এইমুহূর্তে যারা আছেন, তাদের একজন বিখ্যাত লোকশিল্পী হলেন পুরুলিয়ার ঝুমুরশিল্পী সালাবৎ মাহাতো। এছাড়াও লক্ষ্মণ দাস বাউল সহ আরও অনেকেই আছেন।

*প্রশ্ন:* ২০১৭ তে প্রখ্যাত লোকশিল্পী কালিকা প্রসাদের অকাল প্রয়াণে লোকসংস্কৃতির জগৎ ঠিক কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
*উত্তর:* কালিকাপ্রসাদ শিলেটের ছেলে ছিল। ওর সাথে আমার যখন পরিচয় হল তখন একটা অসাধারণ জিনিস আমি ওর মধ্যে লক্ষ্য করেছিলাম, যে ও শুধু শিল্পীই নয়, একজন গবেষকও। কালিকা গানের সুর ধরে তার শিকড়ে যাওয়ার চেষ্টা করতো। ও যেখানেই লাল পাহাড়ি গাইতো বার বার বলতো আমার প্রিয় কবি অরুণ চক্রবর্তীর গান গাইছি। ওর অনুপস্থিতিতে লোকসংস্কৃতির জগৎ কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত তো হচ্ছেই।

*প্রশ্ন:* আপনার মতে এই লোকসংস্কৃতির ক্ষেএ হিসাবে আমাদের রাজ্য বাংলাদেশের মধ্যে কে এগিয়ে রয়েছে?
*উওর:* সে ক্ষেত্রে বলি বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়ে আমাদের রাজ্যের তুলনায়। ফরিজা পারভিন লালনের অসাধারন গান গুলো করেন।এরপরে মনসুর ফকির আর পার্বতী বাউলতো আছেনই।

*প্রশ্ন:* আপনি কিভাবে এই লোকসসংস্কৃতটাকে আপনার মতো করে তুলে ধরেন?
*উত্তর:* সততার মূল্য আছে।সহজিয়া কবিতা “লাল পাহাড়ির দেশ”-এ ঝুমুর সুর দেওয়া হয়েছে।সহজিয়া সুরের মাধ্যমে মানুষের বোধ, চেতনা, ভালোবাসা তাদের অন্তরের কথাকে ফুটিয়ে তুলতেই মানুষের কাছে পৌঁছনো যায়।

*প্রশ্ন:* এই লোকসংস্কৃতির উপরে এতো সুন্দর সুন্দর গান ও কবিতা আপনি লিখেছেন…. আপনার কি মনে হয় আপনি এর কতোটা যোগ্য সম্মান ও ভালোবাসা পেয়েছেন?
*উত্তর:* আমি কিছু পাওয়ার জন্য লিখিনি-ভালোবাসার জন্য লিখেছি।আমি একা মানুষের সাথে হেঁটেছি।মানুষের ভালোবাসাটাই আমার কাছে অনেক কিছু পওয়া।

*প্রশ্ন:* আপনাকে অনেকগুলি অনুষ্ঠানে আপনার সহকর্মীদের সাথে গান গাইতেও শুনেছি, কবিতা লেখার পাশাপাশি এই গানের প্রতি অনুরাগ কিভাবে জন্মালো?
*উত্তর:* আমাদের ভারতীয় একজন বিখ্যাত কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’-তে অসাধারণ সুন্দর একটি গান ছিল,সেইটা পড়েই আমার গানের প্রতি আগ্রহ তৈরী হয়েছিল।

*প্রশ্ন:* এই লোকসংস্কৃতি আধুনিক প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের মনকে কতোটা ছুঁতে পেরেছে বলে আপনার মনে হয়?
*উত্তর:* বাউল গান হল দেহতত্ত্বের গান, এইধারার গান যারা গাইছে তাদের এই গানে চটক আছে।আধুনিক প্রজন্ম সেই চটকে পড়ে যাচ্ছে।আধুনিক প্রজন্ম সেই তও্ব গান নিয়ে ভাবতে পারছে না।

*প্রশ্ন:* এই যান্ত্রিকতাময় জনজীবনের কাছে এই গান কতোটা গুরুত্ব পেয়েছে বলে আপনার মনে হয়?
*উত্তর:* রোজকার এই যান্ত্রিক জীবনে মানুষ হাপিয়ে উঠেছে তাই তারা এই জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় লোকসংগীতের দিকে চলে আসছে।সুতরাং যান্ত্রিক জীবনে এর গুরুত্ব অনেক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *